মুশরিক বনাম কাফির: ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও সূরা তাওবার সঠিক প্রেক্ষাপট।
ইসলামি পরিভাষা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে 'মুশরিক' এবং 'কাফির' শব্দ দুটিকে অনেক সময় একইভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কুরআনের শব্দ বিশ্লেষণ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়।
১. মুশরিক ও কাফিরের সংজ্ঞাগত পার্থক্য।
সাধারণত মনে করা হয় যারা মূর্তিপূজা করে তারাই মুশরিক। কিন্তু কুরআনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে:
- মুশরিক: যারা মূলত এক স্রষ্টাকে (আল্লাহ) বিশ্বাস করার দাবি করে কিন্তু তাঁর ক্ষমতার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে। আরবের মুশরিকরা নিজেদের ইব্রাহিম (আ.)-এর অনুসারী দাবি করত এবং আল্লাহকে মানত, তাই তারা ছিল 'মুশরিক'।
- কাফির: যারা ইসলামের মূল তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের ধারণাকেই গ্রহণ করেনি এবং ভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনায় বিশ্বাসী। ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় যেহেতু আরবের মুশরিকদের মতো ইব্রাহিম (আ.)-এর ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত নয় এবং তারা সরাসরি ভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করে, তাই কুরআনের সংজ্ঞায় তারা 'কাফির' (সত্য অস্বীকারকারী/ভিন্ন পথের পথিক), 'মুশরিক' নয়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন!
প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল এবং আপডেট সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হোন।
WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন২. সূরা আত-তাওবা (৯:৫): কেবল মক্কার প্রেক্ষাপট।
কুরআনের ৯ নম্বর সূরার ৫ নম্বর আয়াতে মুশরিকদের হত্যার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে অনেকের ভুল ধারণা আছে। প্রকৃতপক্ষে:
- এই আয়াতটি ছিল মক্কার সেই নির্দিষ্ট মুশরিক যোদ্ধাদের জন্য যারা মুসলিমদের সাথে করা শান্তি চুক্তি বারবার ভঙ্গ করেছিল।
- এটি কোনো ঢালাও আদেশ নয়। এটি ছিল একটি বিশেষ সামরিক কমান্ড।
- ভারতের হিন্দু বা অন্য অঞ্চলের কাফিরদের সাথে এই আয়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ তারা ওই চুক্তির অংশ ছিল না এবং তারা মক্কার সেই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জড়িত ছিল না। কুরআন অনুযায়ী, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত নয়, তাদের ওপর আক্রমণ করা নিষিদ্ধ।
৩. কাফিরদের বিষয়ে কুরআনের মানবিক উপদেশ।
কুরআন কেবল পরকালীন শাস্তির কথা বলে না, বরং পৃথিবীতে অমুসলিম বা কাফিরদের সাথে বসবাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত চমৎকার কিছু জীবনদর্শন ও উপদেশ দিয়েছে:
- জবরদস্তি না করা: ধর্ম নিয়ে কারো ওপর জোর করা যাবে না। "দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।" (সূরা বাকারা: ২৫৬)
- ন্যায়বিচার ও সৌজন্য: যারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত নয়, তাদের সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- আহ্বান হবে সুন্দরভাবে: কাফিরদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত না হয়ে সুন্দরভাবে কথা বলার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
- তাদের উপাস্যকে গালি না দেওয়া: অন্যের ধর্মকে হেয় করা কুরআনে নিষিদ্ধ।
উপসংহার- পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায়কে ঢালাওভাবে 'মুশরিক' বলা ঐতিহাসিক ও শাব্দিক দিক থেকে অসম্পূর্ণ; বরং তারা তৌহিদ বা একত্ববাদের সংবাদ পৌঁছানো হয়নি এমন এক বৃহৎ 'কাফির' গোষ্ঠী। আর সূরা তাওবার যুদ্ধের আয়াতগুলো কেবল মক্কার নির্দিষ্ট অপরাধী মুশরিকদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান পৃথিবীতে সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে কুরআন কাফিরদের সাথে ইনসাফ, সুন্দর আচরণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।
আরও পড়ুন- আপনি কি নেতার পকেটে নাকি নিজের বিবেকের সাথে?
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন